>

কমলেন্দু চক্রবর্তী।

SONGSOPTOK THE WRITERS BLOG | 10/10/2014 |

                   

ছোট আমি  (পর্ব-৪)













মাকাল ফলের কথা মনে পড়ে গেল ৷ আজকালকার ছেলে মেয়েরা বোধ হয় মাকাল ফল দেখেনি বা নাম শোননি ৷ তাই একটু ছোটবেলা ঝাপসা স্মৃতি হাতড়ে মাকাল ফলের কথা লিখছি ৷ দাদা দিদির সঙ্গে প্রকৃতি ভ্রমণে বেরিয়ে দেখি লতানো গাছে সুন্দর লাল গোল গোল মাঠে ছেয়ে আসে ৷ দাদা দিদিদের ‘না যেত না’ কথাটা কানে আসার আগেই আমার মাথায় চলে এল একটা লাল বল , না ফল ৷ এতো সুন্দর যে কোনো ফল হতে পারে তা আমার তখনকার মাথায় আসছিল না ৷ টুকটুকে লাল ঠোঁটটার ছোট্ট জায়গাটা বাদ দিলে একেবারে সুগোল ৷ পাতলা চামড়া – হাতে নিলে তুলতুলে নরম ৷ দাদা বলল,দিলে দাও ৷ আমি ফেলতে রাজী নই ৷ তখন দিদি  বলল, নিক না একটা –এরপর নিজেই আর কোনো দিন নেবে না,বলে দিদি নিজেই আরো একটা মাকাল ফল আমার হাতে দিয়ে বলল,খুব নরম চাপ দেবে না ৷

আমার তখন ওসব কথা কান দেওয়ার অবস্থা নেই ৷ এতো সুন্দর জিনিস পেয়েছি এটা বাড়ি গিয়ে রেখে দেব ৷ বাড়ি ফিরে এলাম প্রায় দৌঁড়ে বাড়ি ঢুকে মেঝেতে রাখতেই একটা গেল ফেটে ৷ ব্যাস আর মাকাল ফলের উপর ঘেন্না হয়ে গেল ৷ একি এত সুন্দর যার বাইরের রুপ তার ভিতরে এত নোংরা যে তাকানো যাচ্ছে না ৷ দাদা বলল দেখলে তো কেন বারণ করেছিলে –দেখ ঠিক বিড়ালে গু (ওর বয়সে বোধ হয় ঐ কাদা কাদা নোংড়া দেশতে জিনিসটা ওটাই প্রকৃত উদাহরণ ) অন্য মাকাল ফলটা ছুঁড়ে বাইরে ফেলে দিলাম ৷ এরপর বইতে পড়ছি মাকাল ফল – অন্যরা কি বুঝত জানি না ৷ কিন্তু তখন থেকে জানি বাইরে সৌন্দর্যই সব সময় ৷ ভিতরে যদি নোংড়া থাকে,তাকেই কথায় বলে ‘মাকালের ফল’৷  

আমাদের একটা সার্কাস টিম গড়ে উঠেছিল ৷ সারা উওরবঙ্গে তখন আমাদের দুটোই আমোদনের ব্যবস্থা ৷ কোলকাতা থেকে যাওয়া যাএা আর কোথা থেকে উদয় হওয়া সার্কাস ৷ যাএার স্টেজে কী হচ্ছে,সেটা তো গোগ্রাসে গিলতামই ৷কিন্তু আমার আগ্রহ বেশি ছিল ওদের গ্রীনরুসের (নামটা তখন জানতাম না) ফাঁকা ফুঁকো দিয়ে অভিনেতাদের সাজপোষাক পরা বা কাজকর্ম দেখা ৷ বিখ্যাত অভিনেতা ছোট ফনী বড় ফনী তখন সব বিশাল নামী ,তখন আমি উওমকুমারের নাম জানতাম না কিন্তু ছোট ফনী বলতে বুঝতাম বিশাল দামী লোক ৷ একদিন ফুটো দিয়ে দেখি ছোট ফনীকে একটা দড়ি বেঁধে একটা পিলারের সঙ্গে লাগিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে ৷ বুঝতে পারলাম এতই মদ খেয়েছে যে নিজে থেকে দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই ৷ সেই অবস্থায় অধিকারী (পরিচালক)ডায়লগ বলে যাচ্ছে,আর ছোট ফনী বিড়বিড় করে বলছে ,ঠিক আছে,এটার পরে ওটা বলব ৷দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল ৷ এত বড় একটা লোক, এত লোক তাকে দেখার জন্য বসে আছে এই ঠান্ডায়, আর যার জন্য এত আগ্রহ সে কিনা নিজের পায়ে দাঁড়াতেও পারছে না ৷ আমি মন খারাপ নিয়ে দর্শকাসনে গিয়ে বসলাম ৷ তখন যাএায় দুধরনের সিট থাকত ৷ মঞ্চের চার ধারে বিরাট এলাকা নিয়ে মাঠের উপর সতরঞ্জি পাতা থাকত ৷ আর সামিয়ানার ধার ধরে থাকত ভিআইপিদের জন্য চেয়ার ৷ তবে আমাদের ভিআইপি পাস থাকতেও সতরঞ্জিতে বসে যাএা দেখাটাই বেশী পছন্দের ছিল , মাঝে মাঝে বসা নিয়ে ছোটখাটো ঝামেলা হত ৷ তবে উওরবঙ্গের শান্ত স্বভাবের মানুষ বেশী গোলমাল যেত না ৷ থাকগে সেদিনের কথাটা শেষ করি ৷ ছোট ফনীকে ওভাবে দেখে আামার পরে দাদাদের বললাম, আজ মনে ছোট ফনী পাট করবে না ৷ সব শুনে মেজদা বলল, ওগুলো এদের রোজই হয় ৷ ঠিকই যাএা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোট ফনী এল, দাপটের সঙ্গে অভিনয় করল এবং প্রচুর হাততালি নিয়ে ফিরে গেল ৷ আমার অবাক হওয়ার কিছু বাকী রইল না, বছরে একবার করে যাএা আর সার্কাস ৷ বেশীর ভাগ সার্কাসের খেলাই আমার একঘেয়ে লাগত ৷ আমি বসে থাকতাম জোকারদের জন্য ৷ হা করে দেখতাম ওদের কান্ড ৷ কার মাথায় কী করে এল সার্কাস পার্টি খেলার ৷ ভাগ হয়ে গেল কে কী করবে ৷ আমি ট্রাপিজের খেলার প্রাকটিস শুরু করলাম ৷ মোটামুটি ভালই পারতাম ৷আার ছিল এিফলার মারাত্মক খেলা ,সেটা আমি যেচেই নিয়েছিলাম ৷ এিফলার খেলা যারা দেখেনি তাদের জন্য একটু বলি ৷ এই এিফলা যেটা সার্কাসের লোকেরা দেখতো সেটা সত্যি মারাত্মক ৷ তিনটে ধারলো  লোহার পাতের গোড়ালো দিকটা একসঙ্গে লাগানো আর মাথায় দিকটা ফাঁক হয়ে তিন দিকে ছাড়ানো ৷ দেখলেই বোঝা যায় বেশ ভারি আর ধারালো ৷ এই খেলা দেখানোর সময় চারধারের আলো বন্ধ করে শুধু খেলায় উপর ফেলা হত আলো –স্পট লাইট ৷ বাজনা বন্ধ করে দেওয়া হত ৷ আর মাইকে দর্শকদের অনুরোধ করা হত শান্ত হয়ে থাকার জন্য ৷ দক্ষ খেলোয়ারটি আসত একটা লোহার রডের উপর ঐ এিফলাটার গোড়ার দিকে লাগিয়ে অনেকটা উপরে তুলত ৷ তারপর হঠাৎ করে নীচের লোহার রডটা সরিয়ে ফেলেই নীচে শুয়ে পড়ত ৷ এিফলা তিন পাত  শরীরে দুপাশে তার এক দুপায়ের ফাঁকে একেবারে শরীর ঘেষে পড়ে মাটি গেঁথে যেত ৷ এই এিফলার যে কোনো ধারালো ফলার একটা যদি একটু এদিক-ওদিক হয়ে যায় সরাসরি শরীরে ঢুকে রক্তারক্তি করে দিতে পারে ৷ আমি কোনো দিন দুর্ঘটনা হতে দেখেনি ৷

আমি প্রথমে মোটাপাটকাঠি –তিনটে এিফলার মতো বেঁধে শুরু করলাম অনুশীলন ৷ একটু একটু করে পাকা হতে —লাগলাম ৷ তখন বাঁশের কঞ্চির মাথায় লোহার পেরেকের মতো ধারালো জিনিস রোজ প্রাকটিস চলল৷ এবং আমি কাজটা এতটাই মন দিয়ে করতাম যে কোনোদিন আঘাত পাইনি ৷আমরা লম্বা লোহার রড গলার খাঁচে বা চোখের উপরে লাগিয়ে ব্যকার করতে পারতাম সহজেই, আসলে সবটাই প্রাকটিস আর সামান্য ট্রিক্স ৷ এই রড বাঁকানোর দুজন লাগত ৷ তারমধ্যে আমি একজন ৷ আরো টুকিটাকি খেলা সবাই শিখেছিল ৷ একটা ট্রাপিজ থেকে অন্য ট্রাপিজে যাওয়ার খেলাটা অবশ্য ছোট বলে আমাকে কোনোদিন দেওয়া হয়নি ৷ তবে এক বাঁশের দড়ির দোলনাটার উপর আমি বেশ কিছু কারিকুরি দেখাতাম ৷ আমার পছন্দের খেলা ছিল দুটো দড়িতে বাধাঁ বাঁশের দোলনায় দাড়িয়ে থাকা অবস্থা হঠাৎ করে হাত ছেড়ে দিয়ে পা বাঁশের সঙ্গে রেখে ঝুলে পড়া ৷ কোনোদিন অসুবিধা হয়নি৷ তবে পায়ের চামড়া দড়ির ঘষায় কেটে যেত ৷ খুব ব্যথা লাগত ৷ ছাল তোলা পায়ে জুতো পরতে পাড়তাম না ৷ তবে ওভাবেই খেলা দেখতাম ৷ আরও নানা ধরনের খেলা শিখেছিল,অন্য ছেলেরা ৷ সার্কাস দেখতে গেলে প্রচুর দড়ি লাগত ৷ কোনো অসুবিধা নেই ৷ মাঠে তো লম্বা দড়ি গলায় বাঁধা অনেক গরু আছে ৷ খুলে নিলেই হল ৷        

আমরা প্রাকটিস করতাম আমাদের কোয়াটার্সের সামনে ছোট্ট মাঠে ৷ বিকালে,বড়রা দেখত আবার কেউ দেখত না ৷ একদিন ঠিক হল শো করতে হবে ৷ টিকিট কাটলে তবে দেখতে পাবে ৷ রেলের পুরানো মোটা ব্রাউন  কাগজের টিকিটের (যা আজকাল প্রায় উঠেই গেছে ) উপর —লেখা হল ‘আমাদের সার্কাস’ ,মূল্য এক আনা , মানে এখনকার মূল্য ছ পয়সা –যা আজকাল অচল ৷ দুদিন ধরে আমাদের মধ্যে যেমন উওেজনা,বড়দের মধ্যেও উৎসুকতা কম নয় ৷ এরওর বাড়ি থেকে শাড়ি, ধুতি চেয়ে এনে জায়গাটা ঘিরে দিলাম ৷ নিজের জোর প্রাকটিস শুরু করলাম ৷ তারপর ঘেরার গেটে একজনকে বসিয়ে টিকিট কাউন্টার খোলা হল ৷ আাশেপাশের প্রায় সবাই টিকিট কেটে ধুকে ছিল ৷ ছোট বড়, এমন কি কোলের বাচ্চারও টিকিট কাটতে হল৷ আমরা যতটা সম্ভব ভালই করলাম ৷ তারপর সেই পয়সার সঙ্গে বড়দের আলাদা করে দেওয়া টাকা মিলিয়ে আমাদের গরম ভাত আর মাংস দিয়ে ফিস্টি হল ৷ আামাদের বামনহাটের দিন শেষ হয়ে গেল,আমরা দোমহতে চলে এলাম ৷ আমি তখন ফোর পাশ করছি ৷ জন্ম আমিন গাও,শৈশব বক্সা,তারপর বামনহাট আর এখন দোমহনী ৷ এযেন ধাপে ধাপে স্কুলের ক্লাসে প্রোমোসন পেয়ে উপরে যাওয়া ৷ আসলে এটা জঙ্গল থেকে  শহরের পথে ৷ যদিও দোমহনীকে কোনো ভাবেই শহর বলা যায় না ৷ এটি একটি রেলওয়ের একটা বড় জায়গা ৷ এখানে প্রথম দেখলাম প্রথমকার শেড যেখানে স্টীম ইঞ্জিনের দেখাশোনা করা হত ৷ ওটা আমার কাছে একটা দেখার নতুন বস্তু ৷ ইচ্ছে করত সারাদিন ওখানে দেখতে ৷ কী করে কয়লা ভরা হয়,কী করে আগুন জ্বালানো হয়,জল কোথায় আর কীভাবে ভরা হয়৷ ওইসব দেখার জন্য সারাদিন ওখানে থাকতে ইচ্ছে করত ৷ ওখানকার কর্মীরা বারণ করত ৷ বলত জল, আগুন যন্ত্রপাতি ভরা জায়গায় থাকাটা ছোটদের উচিত নয় ৷

দোমহনীতে প্রথম দেখলাম ইলেকক্টিক ৷অর্থাৎ যখন আমি দেখলাম স্টেশনে আলো জ্বলছে ৷ কী আলো সমস্ত প্লাটফর্ম জুড়ে ৷ রাত হলেই ওখানে যেতে মন চাইত,যেতামও ৷তখনকার দোমহনী বলতে পুরোটাই রেলের রাজত্ব ৷ এলাকার পর এলাকা জুড়ে শুধু রেলের নানা বিল্ডিং আর জমি ৷ তখন ঠিক বুঝতে পারিনি এখন ঐ সব বাড়ি দেখলে স্পস্টই বোঝা যায় যে ওখানে ব্রিটিশরা বসবাস করত ৷ ,স্টেশন বিল্ডিংটা ছিল উঁচু মাটির টিলার উপর ৷প্লাটফর্মটা বেশ বড় ৷ আমার বাবা স্টেশনমাস্টার বলে আমাদের বিল্ডিংটা বেশ বড় ৷ সব লাল রঙের মোটা মোটা দেওয়াল ৷ দেওয়ালগুলো এতটাই চওড়া যে জানালার উপরে আমরা আরাম করে  তিন –চারজন বসে খেলতে পারতাম ৷ দুটো জিনিস প্রথম দেখলাম ৷ একটা হচ্ছে স্কুল অন্যটা রিক্রিয়েশন ক্লাব বিল্ডিং ৷ স্কুলের কথা আগে বলি ৷ লাল একতলা বিল্ডিং ৷ কিন্তু চট করে দেখলে মনে হবে দোতলা ৷ কারণ বিশাল চওড়া সিঁড়ির ধাপ পরপর অনেকটা উঁচু হয়ে উপরে উঠে গেছে ৷ মোটা দেওয়াল ৷ সাবকী ব্রিটিশদের ঘরাণা ৷ ক্লাস রুমগুলো অবশ্য লম্বা একতলা পাকা ছাদওয়ালের তৈরী ৷ পরপর তিন সারি ক্লাস বিল্ডিংগুলো খিল ৷ আমি তখন ক্লাস ফাইভে এসে ভর্তি হয়েছি ৷ স্কুল একদিনও ফাঁকি দিতাম না ৷ কিন্তু সবকিছু যে বুঝতে পারতাম ,তা নয় ৷ আমি খুব সাধারণ ছাএদের মধ্যেই পড়তাম ৷ একদিন স্কুলে ইন্সপেক্টার এল ৷ কি কি প্রশ্ন করেছিল তা তখন পরিষ্কার হয়নি,কাজেই সেগুলো মনে রাখার কোনো সম্ভবনা নেই৷ কিন্তু একটা প্রশ্ন মনে আছে ৷ আমাকে নিয়ে পরপর বসা তিনজন ছাএের বয়স কত জেনে,সেই বয়সের গড় কত ৷ অন্য দুজন তাদের বয়স বলল ৷ আমি বললাম যে আমার বয়স দশ ৷ ইন্সপেক্টার হাসল আর বলল,নিজের বয়সটাও বলতে পারছ না ৷ ক্লাস ফাইভে কি দশ বছরে পড়া যায়? ঠিক মতো বলো ৷ আমার কান্না পেয়ে যাচ্ছিল ৷ইন্সপেক্টার ক্লাস টীচারকে বলল,একজন পচা ছাএের জন্য অন্য দুজনের গড় করাটা হল না ৷একটু নজর দেবেন ৷ এ ঘটনা আমি বাড়ির কাউকে বলিনি ৷ কিন্তু পরে চিন্তা করে দেখলাম আমি একেবারে ক্লাস টুতে ভর্তি হয়েছিলাম৷ কাজেই আমার বয়সস এক বছর কমই তো হওয়ার কথা ৷ সেই অপমান এখনও মনে আছে ৷

এই যা আমাদের স্কুলের নামটাই লেখা হয়নি ৷পলওয়েল রেলওয়ে হাইস্কুল ৷ আমার পড়া সবচাইতে নামী স্কুল ৷ রেলওয়ের স্কুলগুলো ভালো হয় ৷ কেন ভালো সে নিয়ে পন্ডিতরা বলতে পারবেন, আমার ভালো বলার কারণ ক্লাস রুমগুলো বড়বড়,বসার বেঞ্চগুলো চওড়া-বসে আরাম কিন্তু এসব কারণের জন্য স্কুলকে বলার কোনো কারণ নেই ৷ আসল কারণ, টিফিনে খাবার দেওয়া ৷ কোনো দিন ছোলা,কোনোদিন বানরুটি আর মাঝে মাঝে আম,লিচুর মতো মৌশুমী ফল ৷ টিফিনের ঘন্টা বাজলেই টিফিন নিতে দৌড় ৷ অনেক সময় ভিজে ছোলা আমরা বাড়ি নিয়ে আসতাম আর সবার ছোলা মিলিয়ে দিদি ভাজা করে দিত ৷ খুব ভালো লাগত খেতে ৷

হেড মাস্টারের কথা তো বলতেই হবে ৷ উপাধি ছিল ব্যাণার্জী ৷ আমার তখনকার দেখা সবচাইতে সুন্দর লোক ৷ লম্বা,ফর্সা সুন্দর গলার আওয়াজ৷ সব সময় সাদা শার্ট,প্যান্ট আর বেল্ট পরতেন ৷ সব স্কুলের মতোই প্রথমে প্রার্থনা হত ৷আমরা মাঠে ক্লাস অনুযায়ী সাড়ি দিয়ে দাঁড়াতাম ৷ হেড মাস্টার অন্যান্য মাস্টারমশাইদের নিয়ে অফিস বিল্ডং এর বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতেন ৷ প্রার্থনা শেষ হলে মাঝে মাঝে একটা দুটো কথা বলতেন ৷ একটা কথা সারাজীবন মনে থাকবে ৷ একদিন প্রার্থনা শেষ হওয়ার পরে আমার দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল,তুমি তো ন্যান্টো আছো ৷ পোষাক পর ৷সব ছাএ-ছাএী আমার দিকে তাকিয়ে দেখছে ৷ আমি অবাক ৷ আমি তো প্যান্ট পরছি ৷ স্কুলের ড্রেস ছিল ৷ মনে হয় সাদা জামা আর খাঁকি প্যান্ট ৷ আমি কয়েকবার আমার পোষাকের দিকে দেখলাম ৷ আমি ন্যান্টো ৷ শুনে পোষাক পরেও নিজেকে উলঙ্গ মনে হচ্ছিল,লজ্জা লাগছিল ৷ তারপর হেড মাস্টারের কথা বুঝলাম শার্ট যদি প্যান্টের মধ্যে গুঁজে না পরা হয় তখন তা না পরার সমান,আমার জামা প্যান্ট গোঁজা ছিল না , সাধারণ ছাএ হিসাবেই ক্লাস সিক্সে উঠলাম ৷ আমার রেজাল্ট নিয়ে না চিন্তা ছিল আমার, না বাড়ির লোকেদের ৷ আমি একেবারে মুখস্থ করতে পারতাম না ৷কাজেই কবিতা বা অন্যান্য বিষয় যা মুখস্থ করার দরকার হত,আমি ভালো করে লিখতে পারতাম না তবে আমি তখন থেকে সবকিছু বোঝার চেষ্টা করতাম ৷ আমার সেজদা বলত,গ্রামারটা ভালো করে শেখি ৷ নিজের ক্লাসের গ্রামার বই পড়ে আমি ওর গ্রামার গ্রামই পড়তাম ৷ সেইজন্য  গ্রামারটা ভালোই পারতাম বলে আমার মনে হয় ৷

একদিন ক্লাসে ইংরাজী মাস্টারমশাই প্রশ্ন করলেন,কুকুরটি দৌড়াইতেছে-এর ইংরাজী কি হবে? ক্লাসে প্রায়ই পড়া না পারা নিয়ে বকুনি খেতাম ৷ আজ আমার দিন ৷ কারণ এটা আমার কাছে খুব সহজ ৷এখুনি বলব – সবাইকে বুঝিয়ে দেব যে আমিও ভালো ছেলে ৷ কিন্তু একটা মুশকিল হল ৷ পড়া পারি বা না পারি আমি কিন্তু প্রথম বেঞ্চেই বসতাম ৷ মাস্টারমশাই কী করলেন, আমি যেদিকে বসে আছি,সেদিক থেকে শুরু না করে অন্য ধারের বেঞ্চ থেকে একএক করে ছাএদের ধরে পড়াটা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন ৷ মানে ওদিক থেকে সারা ক্লাসের ছাএদের কাছ থেকে ঘুরে সব শেষে আমার কাছে আসবে ৷ কিন্তু যদি আমার কাছে আসবার আগেই যদি কেউ উওর দিয়ে দেয়,তবে তো সর্বনাশ ৷ মাস্টারমশাই একটা একটা ছেলেকে প্রশ্ন করছে,আর আমি মনে মনে ভাবছি ছাএটি যেন না পারে ৷ একজন করে ছাএ পারছে না,আমি উওেজিত হয়ে পড়ছি ৷ প্রশ্ন ঘুরতে ঘুরতে আমার প্রায় কাছে চলে এসেছে ৷ আমার হার্ট উওেজনায় ধকধক করছে ৷ আমি আর বসে থাকতে পারছিলাম না ৷ আর মাএ একজন ৷সেও পারল না ৷ মাস্টারমশাই আমার দিকে তাকানোর আগেই বলে উঠলাম ‘The cat is running’ এবার মাস্টারমশাই –এর তারিফ শোনার জন্য ওনার মুখের দিকে তাকালাম ৷কিন্তু একি ? মাস্টারমশায়ের মুখে হাসির বদলে বিরক্তি ৷ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,Stand up on the bench. আমি তো একেবারে
 যেন আকাশ থেকে পড়লাম, কিছুই বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়েই থাকলাম ৷ আমি বেঞ্চে উঠিনি দেখে মাস্টারমশাই আমাকে আবার  ধমক দিলেন ৷ আমি বেঞ্চে উঠে দাঁড়ালাম ৷ এত দিন স্কুল করেছি কিন্তু কোনো সময়েই আমাকে বেঞ্চে উঠে দাঁড়াতে হয়নি ৷ ভীষণ লজ্জা লাগছিল, -এই তোমার পড়াশোনার লক্ষণ ক্লাস সিক্সে পড় ; কুকুর ইংরাজী জানো না ? তোমাদের পাড়ায় কি কুকুরকে ক্যাট্ বলে, আমি বুঝলাম আমার ভুলটা ৷ কিন্তু এবার আর লজ্জা লাগল না ৷ বরং অদ্ভুত লাগল ৷ স্যারের প্রশ্ন ছিল,কুকুরটি দৌড়াইতেছে ৷ কুকুরের ইংরাজী সবাই জানে ৷ কিন্তু প্রশ্নটা আমার কাছে আসতে এতটাই দেরী হচ্ছিল যে আমি উওেজেনা বশত: ভুল আমার হয়েছে কুকুর বিড়াল সব গুলিয়ে Cat বলেছি কিন্তু  কথাটা অন্য জায়গায় ৷ এটা তো গ্রামারের ক্লাস ৷ এখানে tenseটা ঠিক হচ্ছে কিনা সেটাই আসল প্রশ্ন ৷ Subject টা নয় ৷ ক্লাস শেষ হল ৷ আর শুরু হল ক্লাসের বন্ধুদের উৎসাহজনিত চীৎকার,এমা, কুকুর ইংরাজী জানে না ৷ তোদের বাড়িতে কি সবাই কুকুরকে Cat বলে ? তুই কোন দেশ থেকে এসেছিস ৷সারাদিন ধরে ছেলেরা এভাবেই বলে গেল ৷ এভাবে কারো কয়েকদিন চলল ৷

আমি সেদিন নিজের মধ্যে অদ্ভুত অনুভূতি পেলাম ৷ বন্ধুদের ও সব কথায় একবারে৷ মনে হল না যে ওদের আমি বলি যে তোঁরা তো tenseটা বলতে পারিস নি একজন ও ৷ তোরা তো কিছুই পারিস নি,তবে নিজেদের কথা না ভেবে আমার সঙ্গে লাগছিল কেন? কিন্তু ওসব  কথা ভাবছিলাম না ৷ আমার কেন জানি ভিতর থেকে নিজেকে বড় মনে হল ৷মাস্টারমশায়ের জন্য কেমন করুণা হতে লাগল ৷ এবং মনে সারাজীবন আমার মধ্যে একটা প্রতিবাদের ভাব আছে,তার বীজ সেদিনই পোতা হল ৷

পরবর্তী কালে আমিও ডাক্তারী ছাএ পড়াবার মাস্টার  হয়েছিলাম ৷ তখন সেদিনের ঘটনাটা বারবার মনে পড়ত ৷ একটি ছাএ যদি অনবধনা বশত: ভুল বলে ফেলে,তখন তাকে আমি বলতাম  প্রশ্নটা আর একবার ভালো করে শুনে উওর দাও৷ ছাএটি তৎক্ষণাত সঠিক উওর দিয়ে দিত ৷সেদিন যদি ক্লাস ফাইবের ঐ মাস্টারমশাই একবার প্রশ্ন না ভালো করে শুনে উওর দিতে বলতেন,তবে সেদিন ভালো উওর দেওয়ার জন্য বাহবা দিতেন ৷কিন্তু তিনি সে পথে যাননি ৷ কেন জানি না সে বছরই সেই মাস্টারমশাই বদলি হয়ে চলে গেলেন ৷ আর তার বদলে যিনি এলেন,তিনি –থাক এখন না ৷

ক্লাস সিক্সের কথা আর তেমন কিছু নেই ৷শুধু সরস্বতি পূজোর কয়েকদিন আগে ভবেশদা (না,বামনহাটের নয়,দোমহনীর ভবেশদা)আমার তখন ধারণা হয়েছিল ভবেশদা কোনো ব্যক্তি নয়,একটা প্রতিক ৷ প্রতিটি স্কুলে একজন করে ভবেশদা থাকে ৷ তারা দেখতে বেশ গাট্টাগোট্টা হয় ৷ বছরের পর বছর একই ক্লাসে পড়ে ৷ এখন পড়ে ক্লাস এইট দু-তিন বছর ধরে  ৷ ভবেশদাদের কাজ হল,ছোটছোট ছেলেদের শারীরিক বিষয়ে জ্ঞান দিয়ে অ্যাডাল্ট করার চেষ্টা ৷ ভবেশদার কথা একটু পরেও বলতে হবে ৷ এখনকার কথাটা বলি ৷ ক্লাস সিক্সের এই কুকুর বিড়ালের ঘটনাটি ঘটে গেছে ৷ হঠাৎ ভবেশদা এসে হাজির-কিরে এখনও সরস্বতী পূজোর চাঁদাটা এখনও দিলি না ? ‘দিলি না’কথাটা কিন্তু ‘দে বা দিয়ে দিস’-এ পর্যায়ে পড়ে না ৷ এটা একটা সরাসরি দোষারোপ বলে আমার মনে হয়েছিল ৷ আমার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জেল বেরিয়ে এসেছিল মনে হল আমি চাঁদার টাকাটা ফাঁকি দিয়েছি৷ একটা কথাও মুখ থেকে বেরলো না ৷ আমি জানি আমাদের প্রত্যেকের নামের চাঁদা একসঙ্গে সেজদার হাতে দিয়েছে ৷ কিন্তু সে সব কথা কিছুই বললাম না –এটা তো আচ্ছা বোকা ছেলে৷ এতে কান্নার কি আছে ? কাল দিয়েদিস ৷ একটা কথা বলি তোকে,দুনিয়াটা কিন্তু কাঁদার জায়গা নয়- যতো কাঁদবি ততোই লোকে তোকে কাঁদাবে ৷ আমি বড় হয়ে কোনোদিন কাঁদিনি ৷ জানি না সেটা ভবেশদার কথায় নাকি আমার নিজস্ব ধারণায় ৷ যতো কষ্ট পাই ততোই আমার মনের জোর বেড়ে যায়৷

এবার ক্লাস সেভেন ৷আমার মনের মধ্যে একটা পরিবর্তন অনুভব করতে পারছি বড় হচ্ছি চেহারার পরিবর্তন হচ্ছে ৷ সরু গোফের রেখা দেখা দিয়েছে ৷ কিন্তু আমি এই পরিবর্তনের কথা বলছি না ৷ আমার মধ্যে একটা মানসিক পরিবর্তন হচ্ছে ৷ মনে হচ্ছে যা হচ্ছে তা সব মেনে নিতে অসুবিধা হচ্ছে ৷ আমার নিজস্ব একটা ভালো-মন্দ বিচারের ভাব আসছে ৷ ভাবছি এটা কি ঠিক হচ্ছে ৷ আমি একটা সাধারণ বোকাসোকা সরল ছেলের কি উচিত বড়দের কাজ নিয়ে কিছু ভাবা ৷ কিন্তু আজকাল বড়দের অনেক কাজই আমার চোখে লাগে ৷ কিছু উওর দিতে ইচ্ছে করে৷ কিন্তু মনের ভাব চেপে থাকি ৷

বিজ্ঞানের ক্লাস চলছে ৷ বিজ্ঞান ক্লাস ৷ আমি ক্লাসে বসে বোধ হয় একটু আনমনা হয়ে পড়েছিলাম ৷ হঠাৎ একটু বশার ফলার মতো প্রশ্নটা আমার একেবারে কানের ভিতর দিয়ে মরমে পৌঁছালো ৷ হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ালাম ৷ মাস্টারমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বলল,কী হল?বল ৷
আমি তখনও দাঁড়িয়ে আছি,আমি তো প্রশ্নটাও শুনিনি ৷ উওর দেব কি ৷ মাস্টারমশাই বিরক্তি হয়ে বললেন ,একটা ছেলেও মরিচা কাহাকে বলে বলতে পারছ না ?

আমি সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নটা পেয়ে গেলাম ৷ বললাম,স্যার যদি একটা লোহার টুকরোকে বাইরের হাওয়া অনেকদিন ধরে রেখে দেওয়া যায়,তবে লোহার উপরে একটা লালচে ধরনের জিনিস তৈরী হয় ৷ এটাকেই জং বলা হয় ৷ উওরটা শেষ না হতেই ক্লাসে বোমা ফাটালেন মাস্টারমশাই ৷ ছোটখাট বোম অবশ্যই ৷ আজই তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করে বলতে হবে তোমার কথা ৷ মাস্টারমশাই  বেশ চীৎকার করেই বলে উঠলেন এটা পড়াশোনার ছিরি ৷ অন্য ছেলেরা পারেনি ঠিক আছে ৷ কিন্তু তুমি যা হোক কিছু বলে ভেবেছো আমি বুঝতে পারব না ? মাস্টারমশায়ের গজর গজর তখনও শেষ হয়নি,আমি ধীরে ধীরে বললাম,স্যার আমি কি ভুল বলেছি ?-ভুল মানে বই খুলে দেখ মরিচা কাহাকে বলে ৷ না থাক, আমিই বই থেকেই পড়ে শোনাচ্ছি ৷ বলেই পড়তে শুরু করলেন,একটি লৌহ খন্ডকে যদি বাহিরের জল-হাওয়ায় দীর্ঘদিন ফেলিয়া রাখা হয়,তবে সেই লৌহ খন্ডটির উপর এক ধরনের লালচে রঙের আস্তরণ তৈরী হয় ৷ এই আস্তরণকেই বলা হয় মরিচা ৷ সেদিন আমি বুঝলাম,হায় এই হল পূঁথিগত বিদ্যা ৷ আমার কিন্তু একটুকু ভয় বা লজ্জা লাগল না ৷ বরং মাস্টারমশায়ের জন্য একটু কষ্ট হল ৷ আমি যা বলছি ,সেটা বাস্তবিক অভিজ্ঞতা ৷ আর  সেই কথাটাই বলছেন বই-এর ভাষায় ৷ অনেকটা ‘এি-ইডিয়েটস’সিনেমার বইয়ের সংজ্ঞার মতন ৷ আমার সেই বয়সেই মনে হচ্ছিল এটা ঠিক শিক্ষা নয় ৷ ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় কোনো কোনো মাস্টার আমাকে একটু আধটু প্রশংসা করতে লাগলেন ৷ ক্লাস সেভেনে আর একটা অদ্ভূত ব্যাপার হল যা আমার কল্পনাও আসেনি আমি সেকেন্ড হয়েছি ৷ এটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি ৷ আসলে রেজাল্ট নিয়ে মাথাই ঘামাতাম না ৷ প্রাইজ ও পেলাম ৷ কিন্তু সেটার গুরুত্ব তেমন ছিল না আমার কাছে ৷ কিন্তু একেবারেই কিছু হল না,তাও নয় ৷ প্রাইজটা বাবার হাতে দিয়ে আমি আবার আমার মধ্যে ঢুকে গেলাম ৷

শীতের সকালে উঠোনে বসে বাবা কাগজ পড়ছে ৷ আমার তখন অরণ্যদেব,গোয়েন্দা রিপ পড়ছে ৷ বাবাকে বললাম,কী পড়ছো,আর পড়তে হবে না ৷ আমি পড়ব ৷ বাবা বলল, দেখো, যারা স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার প্রথম দশজন হয়েছে তাদের সব নাম দিয়েছে ৷ পড়ে আনন্দ হচ্ছে ছেলেগুলোর জন্য ৷
কত ভালো ওরা ৷ বাবার কথার মাঝেই বলে উঠলাম,তুমি  ওদের জন্য এত আনন্দ পাচ্ছো,দেখো একদিন আমার নামও কাগজে থাকবে ৷
বাবা কিছু না বলে হাতের কাগজটা দিয়ে উঠে গেল ৷ মুখটা গম্ভীর ৷মনে হল কথাটা পছন্দ হয়নি ৷ কিন্তু আমার কথাটা মনে ছিল ৷ বিভিন্ন কারণেই পরবর্তীকালে আমার আমার নাম অনেক কাগজে বেরিয়েছে ৷

এ কথার কিছুক্ষণ পরে মা এসে বলল,তুমি ও কথাটা না বললেই পারতে ৷ বাবা খুব কষ্ট পেয়েছে ৷
-কেন মা ? আমি তো ভালো কথাই বলেছি,আমার নামও একদিন কাগজে উঠবে ৷
-ইলা কাল বাবাকে কয়েকটা কথা শুনিয়ে গেছে ৷ তারপর আজ তুমি –৷
-ইলা,ঐ ছোলা চোর ইলা ? বাবাকে কথা শুনিয়েছে ? কেন ?
-ও বলেছে,এবার থেকে আপনার ছেলে ক্লাসে ফার্স্ট হবে ৷ আমরা তো বদলি হয়ে চলে যাচ্ছি ৷

বুঝলাম ইলা থাকলে ওই প্রথম হবে- আমার হওয়া হবে না ৷ চুপ করে কথাটা হজম করলাম ৷সত্যি, ইলা আমাদের ক্লাসে ফার্স্ট গার্ল ৷
এবার একটু ইলার কথার বলি ৷ ইলার বাবা বোধ হয় টিকিট কালেক্টর ছিল ৷ ইলা আমাদের ক্লাসে পড়ত ৷ সারা বছরে ওর নামটা শোনা যেত,ও ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছে ৷ অন্যসময় ওকে নিয়ে বোধ হয় কেউ মাথা ঘামাত না ৷ রোগা,বেঁটে,কালো একটা চেহারা যার বৈশিষ্ট্য হল নাক দিয়ে কফের লাইন ঝুলে থাকত ৷ আমরা প্রায়ই একই মুদি দোকান থেকে জিনিস কিনতাম ৷ বড় হয়েছি বলে মা আমাকে একেবারে লিস্ট ধরে দোকানের জিনিসপএ আনতে দিত ৷ কিন্তু অত বড়ও হয়নি বলে হাটে একা সব্জি বাজারে পাঠাত না ৷  যাকগে ইলার একটা বড় গুণ ছিল ৷ দোকানটা বেশ বড়সর ছিল,কাঠের পাটাতন দেওয়া ৷ ও তিন ধাপ কাঠের সিঁড়ি দিয়ে দোকানের মধ্যে ঢুকে পড়ত,তারপর কি করত ওই জানে ৷ একদিন আমি নীচে দাঁড়িয়ে দেখছি ইলা দোকানে উঠে ছোলার বস্তা থেকে ছোলা নিয়ে নিজের ইজের প্যান্টে গুঁজছে ৷ আমি সোজা দোকানদারকে বলেদিলাম ৷ ধরা পড়তে যাবে দেখে ইলা কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে হুড়মুড় করে পড়ে  গেল মাটিতে ৷ ছড়িয়ে পড়ল সব ছোলা ৷ এমন কি ইজেরের দড়িটাও গেল খুলে ৷

দোকানদার বলল,তাই বলি রোজ এ দোকানে উঠে বস্তার ওখানে কি করে ৷
এখন যখন শুনলাম ইলা বাবাকে এই বলে গেছে যে ও থাকলে আমি ফার্স্ট হতে পারব না,আমি মাকে বললাম, ওরকম চোরদের মতো আমার ফার্স্ট হওয়ার দরকার নেই ৷ মা কি বুঝলো জানি না ৷ আর কোনো কথা হয়নি এ বিষয়ে ৷
যখন আমি স্কুল ফাইনালে দুম করে সমস্ত N.F Rlyএর Division-এ ফার্স্ট এবং পুরো কোচবিহার জেলার প্রথম হলাম,তখন ইলা অন্য স্কুল থেকে কোনো রকমে থার্ড ডিভিসানে পাশ করল ৷

এবার ক্লাস এইট ৷ দুজন টিচার এলেন নতুন ৷ একজন লালমোহন বাবু আর অন্য জন,বলছি ৷ লালমোহন বাবু বাংলা পড়ান ৷ বেশ রসিক এবং কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের বেশ প্রিয় হয়ে উঠলেন ৷ যেমন নামটা লালমোহন তেমনি গোলগাল চেহারা ৷ ওহো এখনকার লোকেরা লালমোহনের –কথা অনেকেই শোনেনি ৷ এটা একধরনের মিষ্টি ৷ বড়বড় গোল কালো জামের মতো রসের মিষ্টি ৷ রং টা একটু লালচে ৷ সত্যিকারের কিনা জানি না,ছাএরা বলত লালমোহন বাবুর লালমোহন মিষ্টি খুব প্রিয় ৷

আমাদের সময় ‘টিচার ডে’বলে কিছু ছিল না ৷ থাকলেও উওরবঙ্গের ঐ প্রান্ত পর্যন্ত হয়তো পৌঁছায়নি ৷ টিচার ডে –এর কথা শুনেছিলাম যখন আমি ক্লাস নাইন বা টেনে পড়ি (১৯৬৩-৬৪সালে) ৷ যাই হোক,আমাদের স্কুলে হত একটা অনুষ্ঠান ৷ গরমের ছুটির আগের দিন ছাএরা মাস্টারদের খাওয়াতো,ছাএরা নিজেরাই বাড়ি থেকে মিষ্টি ইত্যাদি  আনত,আর সব মাস্টারমশাইদের একসঙ্গে করে- নিজের নিজের ক্লাস টিচারদের খাওয়াতো ৷ এর মধ্যে যেমন দামী মিষ্টি থাকত,মায়েদের হাতে তৈরী খাবার থাকত,এমন সাধারণ লজেন্স,বিস্কুট ও থাকত ৷ আমার মনে আছে আমি যখন বামনহাটের স্কুলে পড়তাম,মা লিলি বিস্কুট (ছোট ছোট চ্যাপ্টা গোলাকার) সুতোয় গেঁথে মালা বানিয়ে দিত ৷ মাস্টারমশাইকে মালা পরিয়ে দেওয়া হত ৷ আর সেই মালা থেকে একটা একটা করে খুলে আমাদের দিত ৷

আসছি ক্লাস এইটের কথায় ৷ টিচার ডে তে আমাদের মাথায় এল লালমোহনবাহুর জন্য স্পেশাল লালমোহন মিষ্টি খাওয়ানো হবে ৷ সেই মতো মিষ্টি কেনাও হল ৷ অন্য সব টিচারদের অন্য খাবার ৷ আর লালমোহনবাবুর পাতে দুটো লালমোহন (দুটো মিষ্টি কেনাই ছিল আমাদের মধ্যের মধ্যে)এবার মাস্টারমশাইদের খাবার দেবে কে ? খাবার তখন মনে হচ্ছিল যদি লালমোহনবাবু রেগে যান,যদি লালমোহন দেখে অপমানিত বোধ করেন,তবে হেড মাস্টারমশাই  হয়ত আমাদের ছেড়ে দেবে না ৷ যাই হোক,ভয়ে ভয়ে তো সবাইকে খাবার দেওয়া হল ৷ লালমোহনবাবু লালমোহন একটা হাতে নিয়ে বলল,মাএ দুটো? এতো আমার এক কোণে গিয়ে চুপটি করে বসে থাকবে ৷ আমি টাকা দিচ্ছি সবার জন্য লালমোহন লাও ৷ আমাদের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,কি লালমোহনকে লালমোহন দিয়ে মজা করছো ৷ বেশ বেশ৷

লালমোহনবাবু  গল্প আর একটু বলি ৷ নাদুস-নুদুন চেহারার উপর সাদা সাধারণ পাজ্ঞাবী আর ধুতি ৷ সবসময় হাসিখুশি ৷ কিন্তু আমার এক ক্লাসে পড়ত একমাএ ছেলে ওক একটা পা ছিল সরু আর ছোট ৷ তখন জানতাম না ৷ পরে বুঝেছি ওর পোলিও হয়েছিল ৷ পড়াশোনায় ভালো ছিল ৷ কিন্তু আমাদের সঙ্গে ফুটবল ইত্যাদি খেলত না ৷ ছেলেরা ব্যঙ্গ করত কিন্তু ও কিছু বলত না ৷

লালমোহনবাবু ছিলেন সত্যিকারের খাদ্য রসিক ৷ একদিন ছেলেকে নিয়ে বাজারে গেছে ৷ এককিলো রসগোল্লা কিনেছে ৷ তারপর দোকানে বসেই দুজনে মিষ্টির হাড়ি থেকে দুজনে মিষ্টি খাওয়া শুরু করেছে ৷ ছেলে যতক্ষণ একটা খেয়েছে স্যারের ততক্ষণে পাঁচটা পেটে চলে গেছে ৷ এভাবে রসগোল্লা অসমভাবে বন্টন করার পর,লালমোহন বাবু আর এক হাঁড়ির অর্ডার দিলেন ৷ তারপর ছেলেকে বললেন শোনো মন দিয়ে ভুল করবে না ৷ এই হাড়ি থেকে একটা মাকে দেবে আর বাদ বাকিটা রেখে দেবে ৷ আমি রাতে শোয়ার সময় খাব,আর হ্যাঁ,তুমিও শোয়ার সময় একটা একটা কিন্তু রসগোল্লা খেয়ে শোবে ৷ আর মনে রাখবে রসটা খাবে না বা ফেলবে না,সকালে রুটির সঙ্গে খাব ৷ এটা অবশ্য আমার শোনা ৷ সত্য মিথ্যা জানি না ৷ তবে মাস্টারমশাই যে খেতে ভালবাসতেন এবং অনেকটা পরিমাণে খেতেন সেটা আমরা সবাই জানি ৷

(ক্রমশ)


 
Comments
0 Comments

No comments:

Blogger Widgets
Powered by Blogger.